Bangladesh News24

সব

পিতা হয়েও নিজ কন্যার সাথে পাশবিক যৌনাচার

ড. গাজী মো: আহসানুল কবীর

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের হ্যানোভার। আজ থেকে প্রায় আড়াই শ’ বছর আগে ১৭৬৯ সালে তুলনামূলকভাবে কম আলোকিত যুগে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডার্টমাউথ কলেজ। কলেজটির মটো দেখে হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল। এটি হলো : A voice crying out in the wilderness- বন্যতার মধ্যে একটি সকরুণ আর্তনাদের কণ্ঠ। চমৎকৃত হলাম এ মটোর গূঢ় প্রকাশভঙ্গি দেখে। এর প্রতিষ্ঠাতা এলিজা হুইলকের চিন্তাশক্তির গভীরতা দেখে। সে যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন আমেরিকান সমাজের জংলি পরিবেশের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে উত্তরণের জন্য আতঙ্কময় গহিন বন্য পরিবেশের মধ্যে একটি উচ্চতরঙ্গের আর্তনাদের কণ্ঠ হিসেবেই তিনি কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখনকার চার দিকের পাশবিক আচরণে উন্মত্ত মানুষের মনকে কলুষমুক্ত করার জন্য ‘খ্রিষ্টধর্মীয় শিক্ষা’, অর্থাৎ নৈতিকতা শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই ছিল তার এ প্রয়াস। কেন যেন আজ আমার কাছে এ উদ্দেশ্যটিকে এক প্রোজ্জ্বল আলোকবর্তিকা মনে হচ্ছে। এ মুহূর্তে আমাদের চার দিকে যা কিছু ঘটছে, তা থেকেই আমার এ উপলব্ধি।

একটি কুকুর আর একটি বিড়ালের সামনে দুধের হাঁড়ি আর ময়লার ভাগাড় রাখলে শ্বেতশুভ্র দুধের দিকে কুকুর যাবে না, সে যাবে ওই ময়লার ভাগাড়ের দিকেই। আর একজন মানুষকে ওই পরিবেশে নিয়ে অত্যন্ত উপাদেয় ক্ষীর দিলেও মানুষটি তা খাবে না। একটু দূরত্বে নিয়েই সে তা খাবে। এটি বোঝার জন্য মানুষটির বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন মাড়ানোর প্রয়োজন নেই, পিএইচডি বা পোস্ট ডক্টরেট করারও প্রয়োজন পড়ে না। আল্লাহ তাকে যে মানবিক অন্তর দিয়েছেন তার তাড়নাতেই মানুষ এ কাজটি করবে। তা না হলে পশু আর মানুষে পার্থক্য কোথায়? আল্লাহ কেনই বা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা সৃষ্টির সেরা জীব বানিয়েছেন? আল্লাহ যেমন অনুগত ফেরেশতা জিব্রাইল আ:কে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি ইবলিশকেও বানিয়েছেন। তিনি যেমন মানুষ বানিয়েছেন, তেমনি হিংস্র পশুও বানিয়েছেন। আবার মানুষের চেহারায় ততোধিক হিংস্র জানোয়ারও সৃষ্টি করেছেন। তা তো করবেনই। সাগরের পাশাপাশি পাহাড় না থাকলে, সবুজ সমতল ভূমির ওপরে নীল আকাশ না থাকলে কি চলত? বৈচিত্র্যই তো আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য-বৈশিষ্ট্য-সৌন্দর্য-উপভোগ্যতা-মঙ্গল। কিন্তু সৃষ্টির কোনো অংশ যদি এ উদ্দেশ্যের অপব্যবহার করে যেমন করেছে ইবলিশ শয়তান, তাতে তো স্রষ্টার কোনো দোষ নেই- দোষ খোঁজার প্রশ্নই ওঠে না। আজকের সমাজের কিছু কিছু চিত্র দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? মানুষ কি এতটাই পশু হয়ে যাচ্ছে? প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়, মানুষরূপী পশুর পৈশাচিক আচরণের খবর।

বহুদিন আগে বিদেশের মাটিতে আমার কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়টির আঙিনায় এক নরপিশাচকে দেখেছিলাম যে পিতা হয়েও নিজ কন্যার সাথে পাশবিক যৌনাচার করত। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই জানত, ধিক্কার দিত; কিন্তু লোকটির বিকার ছিল না। এটি ৪০-৪২ বছর আগের কথা। এত দিনে ভুলেও গেছি। কিন্তু এজাতীয় ঘটনা আজ অহরহ চার দিকে ঘটছে। বেশ কিছুদিন আগে দেখলাম দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বাড়ি ফেরার পথে গভীর রাতে পাষণ্ড গাড়িচালক ও হেলপারের লোলুপশিখায় শ্লীলতার পাশাপাশি নিজের প্রাণও হারাল। একই রকম ঘটনা দেখতে হলো আমাদের দেশের মানিকগঞ্জের রাস্তায় গাড়িতে আরেক দুর্ভাগ্যের শিকার গ্রামের ললনাকে।

এই সেদিন গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের পথে চলন্ত ট্রাকে এক বাড়িপালানো কিশোরীর ওপর রাতভর ড্রাইভার ও হেলপারের পাশবিকতার খবর দেখে ভাবলাম এসব পাষণ্ডের দুনিয়ায় বেঁচে থাকার কি কোনো অধিকার আছে? কিছু দিন আগে এক গারো গার্মেন্টকর্মী উত্তরা থেকে বাড্ডার বাসায় ফেরার পথে কয়েকটি পশুর খপ্পরে পড়ে এমনিভাবে নির্যাতিত হয়েছিল। আবার মাত্র সেদিন দেখলাম ডাকাতি মামলার চল্লিশোর্ধ্ব আসামি মাত্র জেল থেকে ছাড়া পেয়েই এসে তার প্রতিবেশী তিন বছরের অবুঝ এক শিশুকে নির্যাতন করে মেরেই ফেলল। কী বলব তাকে, পশু?

অনেক অনেক কম বলা হবে। আরো দুর্ধর্ষ চিত্র হলো, পরিবাগে তথাকথিত উচ্চ সমাজের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির বিকৃত যৌন অভ্যাস। গৃহকর্মী নিয়োগ, পরিবর্তন ও ভোগের পর সাত-আট তলা থেকে নিচে ফেলে দেয়া- কী ভয়াবহ? এরই মধ্যে অতি শিক্ষিত সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষিকা সহকর্মীর প্রতি সিনিয়রের অশ্লীল আচরণের অভিযোগ। আবার রাজনৈতিক দাপটের জোরে বগুড়ার তুফান এবং তার বোন ও স্ত্রীর বর্বরতার তুফান মেইল দেখে মনে হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, হাজী মো: মুহসীন আর ইসমাইল হোসেন সিরাজীর গড়ে তোলা এ সমাজটিতে সত্যিই ব্যাপক ঘুণে ধরেছে। আরো ওপরে গিয়ে- একটি দেশের বড় রাজনৈতিক দলের নীতিবাগিশ প্রধানের বিরুদ্ধে তার দলেরই সংসদ সদস্যার গুরুতর অভিযোগ। এসব কিসের আলামত? কত আর বলব? দেশে-বিদেশে এসব খবরে খবরময়।

নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও হয়। আইন আছে, আদালত আছে। আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। প্রায়ই টেলিভিশনের পর্দায় এসব বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনি, কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে। এক দিকে একটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, অন্য দিকে আরো একাধিক নতুন ঘটনা ঘটছে। এত শাস্তি, এত নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। যারা এসব করছে তারা ভাবে, দু-চার বছর জেল খেটে বেরিয়ে আসা যাবেই। সুতরাং চিন্তা নেই। বেরিয়ে এসে আরো বড় আকারে একই অপরাধ সে করতে পারবে। তাহলে কি আমাদের কিছু করার নেই? অবশ্যই আছে।

আসলে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার, যে শাস্তি অপরাধকারীর জন্য জীবনের বিনিময়ে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কোনো কোনো দেশে কিছু অপরাধকে অমার্জনীয় বিবেচনা করে তার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়। তাদের যুক্তি হলো এ ধরনের গুরুদণ্ডের বিধানের কারণে অপরাধপ্রবণতা ব্যাপকভাবে কমে যায়।

অনেকেই একে হয়তো মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলবেন। কিন্তু কথা হলো মানবাধিকার তো মানুষের জন্য, পশুর জন্য নয়। তার জন্য তো পাশবিক প্রতিকার। একটি হিংস্র পশু যখন গহিন বন ছেড়ে লোকালয়ে এসে আক্রমণ করে প্রাণহানি ঘটায়, তখন তার অপরাধ বিচারের জন্য কেউ কোর্ট-কাচারি বসায় না। গুলি করে মেরে ফেলে। অর্থাৎ নির্বিচার প্রাণহানি বন্ধের জন্য তাৎক্ষাণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তেমনি আমাদের সমাজের বিভিন্ন অংশে ধর্ষণের মতো যৌন ব্যভিচার যেভাবে বেড়ে চলেছে, তার লাগাম টেনে ধরতে হলে বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো প্রয়োজন। যে নারী তার সম্ভ্রমহানির জন্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, তিনি অবশ্যই মিথ্যা বলবেন না। কেউ নিজের সম্ভ্রমকে জড়িয়ে অভিযোগ তোলার মতো এত বড় ঝুঁকি নেবেন না। সুতরাং নির্যাতিত নারীর বক্তব্যই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য। এর সাথে মেডিক্যাল রিপোর্টের প্রমাণ তো আছেই। এসবের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ যত দ্রুত করা যায় এবং এজাতীয় জঘন্য অপরাধের শাস্তি যত কঠোর-কঠিন করা যায় ততই মঙ্গল। তা না হলে সমাজে ও দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো মিসর।

প্রাচীন সভ্যতার এ দেশটির কোনো কোনো অংশে কিছু দিন আগে বখাটেদের ঘৃণিত উৎপাত এমন বেড়ে গিয়েছিল যে, সেখানে দিনের বেলা নারীদের ঘর থেকে বের হওয়াও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থা সৃষ্টি কোনো দেশে কোনো সমাজেই কাম্য নয়। তাই এজাতীয় পৈশাচিক অপরাধের শাস্তি এমন হওয়া উচিত, যা সম্ভাব্য অপরাধকারীর মনে কাঁপন ধরায়। ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে কেউ যেন সাহস না পায়। একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাই পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। এ ছাড়া আমাদের অহঙ্কারের তারুণ্যকেও এ অপরাধপ্রবণতা যেন ছুঁতে না পারে, সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে যত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ততই মঙ্গল।

লেখক : অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ ও সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

image-id-663299

উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি

image-id-663296

আদর্শহীন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী

image-id-662710

তিনি কি ভয় পেয়ে গেলেন

image-id-662704

সরব সবুজে নীরব কর্মী

পাঠকের মতামত...
image-id-662320

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা

ছোট শিশুদের স্কুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই...
image-id-662008

স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা

পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী উভয়ে উপদ্রুত জাতিসত্তার...
image-id-661460

তৃতীয় ধারার জোট গঠনে সব বাধাই অরাজনৈতিক

বিশাল জনসমর্থিত দল না হলেও রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের কাছে কোনো...
image-id-661457

মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ইইউ-মার্কিন বিধি-নিষেধ

মিয়ানমারের ওপর, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বিধি-নিষেধ...
image-id-663597

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা

তিন মাস পর সোমবার অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের...
image-id-663592

ফিফার বর্ষসেরা একাদশে রিয়ালের ৫, বার্সার ৩

সোমবার রাতেই ঘোষণা করা হবে বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর নাম।...
image-id-663588

স্তন কেটে, ধর্ষণের পর লজ্জাস্থানে কাঠ গুঁজে রোহিঙ্গা নারীদের নির্যাতন

আগস্ট থেকে অক্টোবর। পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এরপরও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম...
image-id-663585

তারকাদের সত্য-মিথ্যা ১৩ সেক্স স্ক্যান্ডাল

হলিউড তারকাদের জীবনে ‘স্ক্যান্ডাল’ নিত্যদিনের ঘটনা। বলিউডেও এরকম স্ক্যান্ডাল নিয়ে...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com