Bangladesh News24

সব

হাওর উন্নয়ন প্রকল্পের করুণ অবস্থা

এ এম এম শওকত আলী

সুনামগঞ্জসহ অন্যান্য জেলার হাওর এলাকায় প্রতিবছরই কমবেশি আকস্মিক বন্যা হয়। এ কারণে স্বাধীনতার পর থেকেই এই এলাকা রক্ষার জন্য সব ধরনের সরকারই চিন্তাভাবনা করেছে। ১৯৭২-৭৫ সালে হাওর এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের চিন্তা করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল এ এলাকার জনমানুষের জীবনযাত্রার গুণগত মান উন্নীত করা। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলেও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ জানামতে, সাম্প্রতিককালেও হাওর এলাকায় উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল সময়ে এ ধরনের উদ্যোগ অনেকটাই স্তিমিত হয়। তবে দুটি সরকারি সংস্থা ডুবন্ত বাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ করেছে। বাঁধ নির্মাণের প্রচেষ্টার ব্যর্থতার বিষয়টি গত ১৯ আগস্ট একটি দৈনিকে প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘হাওর প্রকল্প বর্তমানে হিমায়িত’। উল্লেখ্য, এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭০৪ কোটি টাকা।

প্রকল্পকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল হাওরের অধিবাসীদের আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষা করা। দুঃখের বিষয় এই যে প্রকল্প বাস্তবায়নে সামান্য অগ্রগতি অর্জন করা হয়েছে। চার বছরব্যাপী প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকলেও এখন আরো দুই বছর অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হবে। বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে জানা যায়, মোট লক্ষ্যমাত্রার এক-পঞ্চমাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ১১ জন প্রকল্প পরিচালক রদবদল হয়েছেন। এ ব্যর্থতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ আরো দুই বছর বৃদ্ধির আবেদন বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনাধীন।
এ প্রকল্প ২০১১ সালে শুরু হয়। এর নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ২৯টি উপজেলাকে আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষা করা। এ থেকে অনুমান করা সম্ভব যে এর আওতায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে রয়েছে অতীতে নির্মিত বাঁধের পুনঃসংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা। যেকোনো সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রচলিত এ নিয়মেই পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি কেন নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত করা যায়নি সে ব্যাপারে কমিশনের পর্যালোচনাসভায় প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে যা বলা হয়েছে তা হলো, ২০ শতাংশেরও কম অর্থ ব্যয় এ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণই প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতার একমাত্র নিয়ামক নয়। এর সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সার্বিকভাবে দেখা যায় যে নির্ধারিত চার বছরে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। প্রকল্পের এ ব্যর্থতার জন্য গত মার্চ মাসে হাওর এলাকায় যে আকস্মিক বন্যা হয় সে কারণে প্রায় ১০ লাখ টন বোরো ফসল বানে ধ্বংস হয়েছে। এ কারণেই উত্তরাঞ্চলের বন্যায় আমনের ক্ষতির জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় ১৭ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনাসভায় এ বিষয়ে একটি মন্তব্য ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে হাওরের কৃষকরা যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। উল্লেখ্য, আলোচ্য প্রকল্পের শিরোনাম ছিল ‘হাওর এলাকায় প্রাক-বর্ষা মৌসুমের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা প্রকল্প’। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।

প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা না গেলে অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়। অধিক সময়ের প্রয়োজন মানে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। প্রাক-বর্ষা মৌসুমসংক্রান্ত প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হলো বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এবারের আকস্মিক বন্যার আগমন মার্চ মাসে। অতীতের ইতিহাস দেখলেও বলা যায় এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ অতীতেও মার্চ-এপ্রিল মাসে এসব অঞ্চলে বিশেষ করে সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার আঘাত একাধিক বছরে হয়েছে। এপ্রিল-মে মাসেই বোরো ধান কাটার সময়। এবারের মার্চ মাসের আকস্মিক বন্যার তীব্রতা ও ব্যাপ্তি অতীতের তুলনায় অধিক ছিল বলে ধারণা করা যায়। এটা যে হতে পারে তার পূর্বাভাস জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার একাধিক কারণ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কমিশনের সভায় উল্লেখ করেছেন। এক. বরাদ্দ করা অর্থ নির্ধারিত পরিমাণে পাওয়া যায়নি; দুই. বরাদ্দকৃত অর্থ সময় অনুযায়ী পাওয়া যায়নি; তিন. প্রকল্পের জনবল অপ্রতুল ছিল, যে কারণে বাস্তবায়নের অগ্রগতি সময়মতো অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ মাসে করা সম্ভব হয়নি; চার. ওই সময়েও হাওর অঞ্চলে জলমগ্নতা বিরাজ করে; পাঁচ. ৫২টি এলাকায় নির্মিতব্য বাঁধের মধ্যে ৩৬টিই ছিল সুনামগঞ্জ এলাকায়। এর মধ্যে অনেক দূর এলাকায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। এসব জায়গায় অগ্রগতি পরিবীক্ষণের কোনো উপায় ছিল না এবং ছয়. ১১ জন প্রকল্প পরিচালক গত ছয় বছরে রদবদল করা হয়েছে।

বরাদ্দ করা অর্থ কম ছাড়ের বিষয়টি অবশ্য কমিশনের সভায় উপস্থিত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব খণ্ডন করেছেন। তাঁর দাবি, বরাদ্দ করা অর্থ ছাড়ের কোনো ঘাটতি ছিল না। সুনামগঞ্জ এলাকার অনেক জায়গা দুর্গম, অর্থাৎ সহজে ওসব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়টি প্রকল্প প্রস্তাব করার আগেই ভাবা উচিত ছিল। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ কেন করা হলো না? এরপর আসে প্রকল্পে জনবলের অপ্রতুলতার প্রসঙ্গ। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সব ধরনের অনুমোদিত প্রকল্পের আর্থিক ও ভৌতগত (Physical) অগ্রগতি প্রতি মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসংক্রান্ত সভায় মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা করা হয়। অবস্থা দেখে মনে হয়, এ সভা নেহাত রুটিন সভা ছিল। তা না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কোনো কারণ ছিল না। ছয় বছরে ১১ জন প্রকল্প পরিচালক বদলি করা হয়। এর মানে এই যে বছরে প্রায় দুজন বদলি হয়েছেন। প্রকল্প পরিচালকদের এত ঘন ঘন বদলি প্রচলিত সরকারি নিয়মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি কে করবে— মন্ত্রণালয়, না পানি উন্নয়ন বোর্ড?

প্রকল্প বাস্তবায়নের করুণ চিত্রের অন্য একটি কারণও উল্লেখ করা যায়। কিছুদিন আগে এ প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে দুদক সুনামগঞ্জ থানায় ৬১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে ঠিকাদারসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তাও রয়েছেন। পত্রিকান্তরে যা জানা যায় তা হলো, কয়েকজন ঠিকাদারকে রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যার অন্য নাম টেন্ডারবাজি। এ কথা সঠিক যে নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্প পরিচালকরা এ ধরনের ব্যক্তিদের কার্যাদেশে বাধা দিতে সক্ষম হন না। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ করা অর্থ না পাওয়ার যে কথা বলা হয়েছে, তা অনুসন্ধানযোগ্য। এ বিষয়ে এখন যা বলা সম্ভব তা হলো, প্রচলিত নিয়মে মোট চার কিস্তির মধ্যে প্রথম তিন কিস্তি অর্থ ছাড়ে কোনো বাধা নেই। অনুমান করা সম্ভব যে প্রথম তিন কিস্তির অর্থ দিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ হওয়া অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অন্যদিকে প্রকল্পের কর্মকর্তারা শুষ্ক মৌসুমে কাজ করার জন্য খুব কম সময় অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ উল্লেখ করেছেন। এ কারণ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এ কারণ মনে রেখেই একাধিক ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। কাজেই ঠিকাদারপ্রতি কাজের পরিমাণও খুব বড় আকারের হওয়ার কথা নয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যে দুর্বলতা রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ প্রকল্পের মেয়াদ হয়তো বৃদ্ধি করা হবে। এ কারণে ভবিষ্যতে করণীয় কী সে বিষয়গুলো চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। এক. আগামী শুষ্ক মৌসুমের কিছু আগে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের মতামত গ্রহণ করা সমীচীন হবে। তারাই এ বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম; দুই. বরাদ্দ করা অর্থ প্রয়োজনমতো ও সঠিক সময়ে ছাড় করতে হবে; তিন. প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করার অন্তত এক মাস আগেই সম্পন্ন যাতে করা যায় সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে; চার. প্রকল্প বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে পরিবীক্ষণের যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক এবং পাঁচ. প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তারা যাতে ঘন ঘন বদলির শিকার না হন সে বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

image-id-663299

উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি

image-id-663296

আদর্শহীন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী

image-id-662710

তিনি কি ভয় পেয়ে গেলেন

image-id-662704

সরব সবুজে নীরব কর্মী

পাঠকের মতামত...
image-id-662320

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা

ছোট শিশুদের স্কুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই...
image-id-662008

স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা

পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী উভয়ে উপদ্রুত জাতিসত্তার...
image-id-661460

তৃতীয় ধারার জোট গঠনে সব বাধাই অরাজনৈতিক

বিশাল জনসমর্থিত দল না হলেও রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের কাছে কোনো...
image-id-661457

মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ইইউ-মার্কিন বিধি-নিষেধ

মিয়ানমারের ওপর, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বিধি-নিষেধ...
image-id-663597

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা

তিন মাস পর সোমবার অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের...
image-id-663592

ফিফার বর্ষসেরা একাদশে রিয়ালের ৫, বার্সার ৩

সোমবার রাতেই ঘোষণা করা হবে বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর নাম।...
image-id-663588

স্তন কেটে, ধর্ষণের পর লজ্জাস্থানে কাঠ গুঁজে রোহিঙ্গা নারীদের নির্যাতন

আগস্ট থেকে অক্টোবর। পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এরপরও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম...
image-id-663585

তারকাদের সত্য-মিথ্যা ১৩ সেক্স স্ক্যান্ডাল

হলিউড তারকাদের জীবনে ‘স্ক্যান্ডাল’ নিত্যদিনের ঘটনা। বলিউডেও এরকম স্ক্যান্ডাল নিয়ে...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com