Bangladesh News24

সব

ইসির সংলাপ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা

মোস্তফা কামাল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৩১ জুলাই থেকে সংলাপ শুরু করেছে। প্রথমেই নাগরিক সমাজের সঙ্গে সংলাপে বসে ইসি। এরপর গণমাধ্যমের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে টানা দুই দিন সংলাপ হয়। পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সংলাপ শুরু হয়েছে।

প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত সংলাপে যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টি। প্রায় প্রত্যেকেই এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচন সফল হবে না। তবে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে করণীয় কী—সে পথও বাতলে দিয়েছেন নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিরা।

সংলাপ অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের চেয়েও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী। ভারতে ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই নির্বাচন হয়; কিন্তু সেখানে ক্ষমতাসীন দল কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। রুটিন কাজের বাইরে আর কিছুই করে না। করার এখতিয়ারও নেই।
নির্বাচনী প্রচারকাজে কেউ সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে পারেন না। কি বিরোধী, কি ক্ষমতাসীন—সব দলই সমানভাবে বিবেচিত হয় ইসির কাছে।

আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচনে যেতে অন্য দলগুলো ভয় পায়। কারণ ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নির্বাচনের আগে আগে প্রশাসনকে সেভাবেই সাজানো হয়। সরকারের এই প্রভাববলয় ভাঙার জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ব্যর্থ হলেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোনো জেলা প্রশাসক নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিতে হবে। আমাদের প্রতিটি জেলায়ই নির্বাচন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। নির্বাচনের সময় তাঁরাই জেলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাঁদের আইনের মাধ্যমেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনকে ব্যাপকভাবে ক্ষমতাবান করার পরও তারা যদি ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে নির্বাচনে কারচুপি হতে বাধ্য। কথায় আছে, ‘চেয়ার মেকস এ ম্যান পারফেক্ট’; কিন্তু আমার মনে হয়, ‘ম্যান মেকস এ চেয়ার পারফেক্ট’। যেকোনো প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একজন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়। অতীতে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। আবার কিছু কলঙ্কিত ইতিহাসও আছে। কেউ কেউ তাঁদের কৃতকর্মের জন্য ন্যক্কারজনকভাবে ইসি থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমরা সেই কলঙ্কিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে পর্যালোচনা করতে চাই না।

আমরা সামনে এগোতে চাই। আমরা বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে আশাবাদী হতে চাই। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচন করে তারা ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে ছয়টি সিটিতে নির্বাচন হবে। আমার ধারণা, ছয় সিটির নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হলে অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা বাড়বে। তবে ইসি কোনো রাজনৈতিক দলকে খুশি করার জন্য কিছু করবে না।

জেলায় জেলায় ইসির নির্বাচন কর্মকর্তা আছেন। তৃণমূলে কোথায় কী সমস্যা, তা তাঁরাই ভালো জানেন। তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোন এলাকা চরম ঝুঁকিপূর্ণ, কোন এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ বা কম ঝুঁকিপূর্ণ তা অনুসন্ধান করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ইসিতে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আরো আলোচনা হবে। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছা দরকার। আমি মনে করি, সীমানা নির্ধারণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা ও আয়তন উভয়ই বিবেচনায় রাখা দরকার। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, যা নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করবে।

সংলাপে অনেকেই সেনা নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেছেন। আমি মনে করি, সেনাবাহিনী নির্বাচনে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে। পুলিশ-বিজিবির পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে সেনাবাহিনী থাকলে কেউ অশান্তি সৃষ্টি করার সাহস পাবে না। তবে এর পরও যদি কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা ভোট কারচুপি হয়, তাহলে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংলাপে অনেকেই বলেছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার করার বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। আমরা জানি, এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে অবস্থান করছেন। তাঁরা সবাই ভোটার নন। তবে যাঁরা ভোটার তাঁরা যাতে প্রবাসে বসে ভোট দিতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের যে দূতাবাস রয়েছে, সেখানে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উন্নত দেশগুলো জাতীয় নির্বাচনের সময় তাদের প্রবাসী ভোটারদের জন্য দূতাবাসগুলোতে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করে থাকে।

আগামী নির্বাচনে ছিটমহলের ভোটাররা প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে কেউ যাতে ভোটার হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। একইভাবে দেশের ১৮ বছর বয়সী তরুণদের ভোটার করার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইসির কিছু গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার হওয়ার যোগ্যদের তথ্য সংগ্রহ করে ভোটারতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ অধিকার থেকে তরুণদের বঞ্চিত করা যাবে না।

অথচ এ কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়নি। কোনো কোনো সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, তাঁদের সন্তানদের ভোটার করতে বেগ পেতে হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে কী ঘটছে, তা আর বুঝতে বাকি নেই।

সংলাপে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে গিয়ে নিজেদের দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নৌকা অথবা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। নৌকা আওয়ামী লীগের প্রতীক আর ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক। নির্বাচন কমিশনে তালিকাভুক্ত প্রতিটি দলের নিজস্ব প্রতীক রয়েছে। স্রেফ ভোটে জেতার জন্য তারা বড় দুই দলের প্রতীক ব্যবহার করে। এতে তাদের দলীয় অস্তিত্ব থাকে না। বিষয়টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে ইসি উত্থাপন করতে পারে।

জামায়াত এখনো বিএনপি জোটে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন নেই। সংগত কারণেই তারা বিএনপির দলীয় প্রতীকে অংশ নিতে পারে। আবার ভিন্ন নামে ইসির নিবন্ধন নিতে পারে। এই সুযোগ যাতে জামায়াত নিতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে ইসির।

সংলাপে নির্বাচনী ব্যয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় ধার্য করা আছে; কিন্তু প্রার্থীরা বলেন, চা-পান খাওয়াতেও এর চেয়ে দ্বিগুণ খরচ হয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে আমরা কালো টাকার ছড়াছড়ি দেখেছি। দেখেছি পেশিশক্তির ব্যবহার। কালো টাকা ও পেশিশক্তি অবাধ নির্বাচনের বড় অন্তরায়; কিন্তু আমরা এর থেকে বের হতে পারছি না।

অনেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্বাচনে জিতে সেটা তোলার জন্যই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ জন্য তাঁদের দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়। আর রাজনীতিবিদরা নির্বাচনী মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন। একপর্যায়ে রাজনীতি থেকেই তাঁদের বিদায় নিতে হয়। কালো টাকার মালিকরাই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছেন। ফলে শুধু একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই মূলকথা নয়, টেকসই গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতিকে কালো টাকা ও পেশিশক্তির কবল থেকে মুক্ত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলো এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে পারে। ইসির সঙ্গে সংলাপে বড় দুই রাজনৈতিক দল প্রস্তাব রাখতে পারে, কোনো দলই আগামী নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার করবে না। এই মর্মে তারা অঙ্গীকার করতে পারে। গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে তারা বক্তব্য দিতে পারে।

শেষ করার আগে সিনিয়র দুজন সাংবাদিকের মন্তব্য এখানে তুলে ধরতে চাই। গণমাধ্যমের সঙ্গে ইসির সংলাপে আমিও অংশগ্রহণ করেছি। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে সাংবাদিকদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। কথার ফাঁকে একজন সম্পাদক বললেন, ইসির নতুন ভবনটা খুব সুন্দর। কিন্তু নির্বাচনটা…!

আমরা হাসলাম। তারপর বললাম, ঠিক বলেছেন। শুধু ভবন সুন্দর হলে হবে না, নির্বাচনও সুন্দর হতে হবে।

আরেকজন সিনিয়র সাংবাদিক তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই সিইসি সাহেবের সমালোচনা করে বললেন, ‘আপনি সাংবাদিকদের সামনে শিরদাঁড়া সোজা করে বলেছেন—দেখুন, আমার মেরুদণ্ড সোজা আছে। কাজেই সিইসি মেরুদণ্ডহীন নয়। এ ধরনের হালকা বক্তব্য আপনার মুখে শোভা পায় না। এই বক্তব্যে আমরা হতাশ হয়েছি। ’

তবে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ হবে বলে আমরা আশাবাদী। আমরাও দেখতে চাই, সিইসি নূরুল হুদার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ড সোজা করেই অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব করবে না। কোনো অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলিহেলনে হেলে পড়বে না। দেশের সাধারণ মানুষও সাহসী ও সুদক্ষ একজন সিইসি এবং কমিশনারদের দেখতে চায়। সেটা তাঁরা কাজ দিয়েই প্রমাণ করবেন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com

image-id-663299

উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি

image-id-663296

আদর্শহীন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী

image-id-662710

তিনি কি ভয় পেয়ে গেলেন

image-id-662704

সরব সবুজে নীরব কর্মী

পাঠকের মতামত...
image-id-662320

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা

ছোট শিশুদের স্কুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই...
image-id-662008

স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা

পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী উভয়ে উপদ্রুত জাতিসত্তার...
image-id-661460

তৃতীয় ধারার জোট গঠনে সব বাধাই অরাজনৈতিক

বিশাল জনসমর্থিত দল না হলেও রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের কাছে কোনো...
image-id-661457

মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ইইউ-মার্কিন বিধি-নিষেধ

মিয়ানমারের ওপর, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বিধি-নিষেধ...
image-id-663597

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা

তিন মাস পর সোমবার অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের...
image-id-663592

ফিফার বর্ষসেরা একাদশে রিয়ালের ৫, বার্সার ৩

সোমবার রাতেই ঘোষণা করা হবে বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর নাম।...
image-id-663588

স্তন কেটে, ধর্ষণের পর লজ্জাস্থানে কাঠ গুঁজে রোহিঙ্গা নারীদের নির্যাতন

আগস্ট থেকে অক্টোবর। পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এরপরও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম...
image-id-663585

তারকাদের সত্য-মিথ্যা ১৩ সেক্স স্ক্যান্ডাল

হলিউড তারকাদের জীবনে ‘স্ক্যান্ডাল’ নিত্যদিনের ঘটনা। বলিউডেও এরকম স্ক্যান্ডাল নিয়ে...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com