Bangladesh News24

সব

রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ করবে কে?

এ কে এম আতিকুর রহমান

আমরা জানি, গত বছরের অক্টোবরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান জীবন বাঁচাতে পাশের বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়। তবে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয় হয় বাংলাদেশে। এর আগে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ওই সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যায়। মাঝের কয়েক মাস থেমে থাকলেও গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। জানা মতে, এদের মধ্যে কয়েক শ হিন্দু ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাও রয়েছে।

এই যে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী এবং ইদানীং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যোগ দেওয়া বেসরকারি লোকজন মানবাধিকারের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ অর্থাৎ নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে—বিশ্বের কাছে এর কি কোনো জবাবদিহি নেই? এই যে মিয়ানমারের মাটিতে শত শত লাশ পড়ে আছে, নাফ নদে শিশু ও নারীদের লাশ ভাসছে, রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে, এই নৃশংসতা কি মানবিকতাকে আঘাত করে না? জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ান ইত্যাদি সংস্থার কি কোনো ক্ষমতাই নেই মিয়ানমারের এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করার? বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো যেমন ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা বর্তমান বিশ্বের মহাশক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কি এ ব্যাপারে কোনো চাপ সৃষ্টি করার ইচ্ছা ও ক্ষমতা আছে? মিয়ানমার কি এতই শক্তিশালী যে সে কারোরই তোয়াক্কা করে না? তাহলে রোহিঙ্গা নিধন কি চলতেই থাকবে, যত দিন না একজন রোহিঙ্গাও বেঁচে থাকে?

আসলে কারো তেমন একটা ঠেকা পড়েছে বলে মনে হয় না। যত দায় বাংলাদেশের। এতগুলো মানুষকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য যে কত কষ্টকর তা বিশ্ববাসী সবার জানা। ছোট্ট আয়তনের দেশটি নিজের লোকজনেরই ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। তা ছাড়া এতসংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য, আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়াসহ জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও হুমকির মধ্যে থাকে। সর্বোপরি ভিটামাটি ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর মনে যে ক্ষোভ ও বঞ্চনার আগুন সুপ্ত রয়েছে, তা যে কোনো দিন জ্বলে উঠবে না, এটা কেউ বলতে পারে না।
আর যদি এমন কিছু কখনো ঘটে তার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশ কেন নিতে যাবে? আমরা অবশ্যই রোহিঙ্গাদের প্রতি অমানবিক হতে পারি না; কিন্তু তারও তো একটা সীমারেখা রয়েছে। সেটা ভুলে গেলে মিয়ানমার এমনই আরো অনেক সমস্যার মধ্যে বাংলাদেশকে দাঁড় করাবে। আমার এ আশঙ্কার কারণ মিয়ানমার সরকারের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যতেই নিহিত রয়েছে। তারা এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি উগ্রবাদী’ বলে আখ্যায়িত করে ফেলেছে। এ ছাড়া বিশেষ উদ্দেশ্যে তাদের হেলিকপ্টার বেশ কয়েকবারই বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে।

রোহিঙ্গারা সবাই মিয়ানমারেরই নাগরিক। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোনো ভাবনার অবকাশ নেই। যেমন মালয়েশিয়ায় রয়েছে চায়নিজ মালয়েশিয়ান বা ইন্ডিয়ান মালয়েশিয়ান। তাদের কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান। তাদের তো মালয়েশিয়া সরকার বা সে দেশের মানুষ ভিটামাটি ছাড়া করে তাড়িয়ে দেয়নি। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি হিসেবে পরিচিত ডা. মাহাথির ইন্ডিয়ান মালয়েশিয়ান হয়েও দীর্ঘ ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এখনো মালয়েশিয়ার মন্ত্রিপরিষদে ভারতীয় বা চায়নিজ মালয়েশিয়ান অনেকেই রয়েছেন। কই এ নিয়ে কেউ তো কোনো প্রশ্ন তোলেনি? ডা. মাহাথিরের প্রপিতামহ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতবর্ষ থেকে মালয়েশিয়ায় গমন করেছিলেন। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস তার চেয়ে কোনোক্রমেই পরের ঘটনা নয়। এ ধরনের বিভিন্ন ধর্ম বা গোষ্ঠীর মানুষের অভিবাসন সভ্যতা বিকাশের জন্য একসময় অনিবার্য কারণেই ঘটেছিল। বাংলাদেশসহ এমন আরো হাজারো উদাহরণ রয়েছে পৃথিবীজুড়ে; কিন্তু কোনো দেশই মিয়ানমারের মতো এমন নৃশংস অমানবিক ঘটনা ঘটায়নি।

প্রসঙ্গত, আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতেই হয়। তদানীন্তন বার্মা ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার একটি প্রদেশ। বার্মা ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক ধরেই সেদিন স্বাধীন বার্মার সীমানা টানা হয়েছিল। এর আগের বছর ভারত আর পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকেই স্বাধীনতা লাভ করে। দেশ বিভাগের ফলে পাকিস্তান ও ভারতে অবস্থানরত অনেকেই তখন ইচ্ছাকৃতভাবে নাগরিকত্বের পরিবর্তন ঘটায়, অন্যথায় যে যেখানে অবস্থান করছিল সে সেখানেরই নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। কারণ একটি দেশ স্বাধীন হয় ভূমির জন্য নয়, মানুষের জন্য। রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকানের অর্থাৎ রাখাইনের অধিবাসী ছিল। তারা অপশন দিয়ে অন্য দেশ থেকে, বিশেষ করে পাকিস্তান বা ভারত থেকে আসেনি। সংগত কারণেই রোহিঙ্গারা স্বাধীন বার্মার অর্থাৎ বর্তমান মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে সেখানে বসবাস করতে থাকে। তারা তো ১৯৪৭ সালে বা পরবর্তী সময় ১৯৭১ সালে ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে এসে মিয়ানমারে বসবাস শুরু করেনি? ডিকলোনাইজেশনের সময় পৃথিবীর অনেক দেশেই এমনটা ঘটেছে।

বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে। এর সত্যতা যেন খুঁজে পাওয়া যায় মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদের ঘটনায়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে পারি সদ্য উপস্থাপিত আনান কমিশনের প্রতিবেদনের কথা; ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দুইবার মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরের কথা; এ বছরের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের কথা; জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডির মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ সফরের কথা; রোহিঙ্গাসংক্রান্ত বাংলাদেশের জাতীয় টাস্কফোর্সের কথা। তাদের কর্মকাণ্ডের বিশদ বিবরণ এখানে দেওয়ার আবশ্যকতা হয়তো বা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে তাদের প্রয়াসের উল্লেখ না করে হয়তো পারা যাবে না। আমার কেন জানি মনে হয়, মিয়ানমার সরকার যদি না একগুঁয়ে মনোভাব ত্যাগ করে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান করা কোনো দিন সম্ভব হয়ে উঠবে না।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার সফর শেষে ঢাকায় এসেছিলেন। ওই সময় তিনি কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে শরণার্থী শিবিরসহ ওখানকার অস্থায়ী শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। সার্বিক অবস্থার আলোকে তিনি তখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারের গুরুত্বের কথা বলেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উৎস যেহেতু মিয়ানমারে, তাই সমাধানটিও সেখানেই। তাঁর মতে, রাখাইনের সংখ্যালঘু ওই জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এখানে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো রোহিঙ্গাদের ‘নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা’ প্রসঙ্গটি। মিয়ানমারের নাগরিক বলেই তো বংশানুক্রমে তাদের ভিটামাটি, জায়গাজমি ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এখন আবার নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কি কোনো প্রয়োজন আছে? যাচাইয়ের কাজটি করবে কে? নাগরিকত্বের বৈশিষ্ট্যই বা কী হবে এবং কে নির্ধারণ করবে? যাচাইয়ের সময় যদি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে, তাহলে সে কোন দেশের নাগরিক হবে? সে ক্ষেত্রে সেই লোকটির গন্তব্য কোথায় হবে? নিশ্চয়ই তার ঠিকানা বাংলাদেশে হবে না। প্রাসঙ্গিক কারণেই বিষয়টি আমাদের দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়; যদিও ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং সে হিসেবেই ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের অনেক আগে থেকেই পুরুষানুক্রমে তারা মিয়ানমারের অর্থনৈতিকসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করে আসছে। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যে তাদেরই আজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য দেশে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচাতে হচ্ছে।

গত মাসের ২৩ তারিখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশনের প্রধান জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান মিয়ানমার সরকারের কাছে তাঁর চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয় আনান কমিশনের। যে আশা নিয়ে তারা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেছিল, তা আর আলো দেখার সুযোগ পেল না। দেখেশুনে এটাই মনে হয়, সবই যেন তাদের পূর্বপরিকল্পিত।

এদিকে মিয়ানমার সরকার বলেছে যে ২৫ আগস্ট ভোরে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি নামের বিদ্রোহীরা ২৫টি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালালে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়। অবশ্য ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে অনেকেই। কেউ কেউ এটিকে আবার মিয়ানমারের সাজানো নাটক বলে উল্লেখ করেছে। কারণ ওই এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার না থাকায় সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগও নেই। তবু যদি ওই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেই থাকে, তা আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অবশ্যই মিয়ানমারকে সহযোগিতা করবে। আসলে ওই সব কর্মকাণ্ডের কারণ খুঁজে তার প্রতিকার করতে হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সমর্থন করে না বা বাংলাদেশের মাটিতে কোনো সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয়ও দেয় না; কিন্তু মিথ্যা অজুহাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিলে বাংলাদেশ কিছুতেই তা মেনে নিতে পারে না।

কয়েক দিন আগে মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে আলোচনার জন্য মিয়ানমারকে প্রস্তাব দিলে মিয়ানমার আলোচনায় বসতে সম্মত হয়নি। এদিকে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা সফরে আসেন এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি গত বছরও এসেছিলেন। আসিয়ান ফোরামে না হলেও ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয়ভাবে অবশ্যই দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ডকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তবে মিয়ানমার তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনায় বসতে সম্মত না হলে তাদের বিকল্প কিছু করার থাকবে বলে মনে হয় না।

কয়েক দিন আগে তুরস্ক সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিবেক ও মানবিকতার তাড়নে সুদূর তুরস্কের মানুষের হৃদয় কাঁদলেও শান্তিতে নোবেলজয়ী মিয়ানমারের নেতা অং সান সু চির হৃদয়ে রোহিঙ্গা হত্যা বিন্দুমাত্র মর্মবেদনা সৃষ্টি করতে পারেনি। তুরস্ক এরই মধ্যে ওআইসির বেশ কয়েকটি সদস্য দেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছে। সর্বোপরি ৬ সেপ্টেম্বর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসেছেন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার জন্য। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে নিজ হাতে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে গেলেন দুই দিন আগে। শুধু মুসলিম দেশগুলোই নয়, অন্য দেশগুলোকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য তুরস্ক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রয়োজনে জাতিসংঘে এবিষয়ক প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারে তুরস্ক। কারণ রোহিঙ্গাদের মুসলমান হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিয়ানমার সফরকালে রোহিঙ্গা বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তেমন একটা গুরুত্ব পায়নি। আশা করা যায়, আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার জন্য ভারত অবশ্যই এগিয়ে আসবে। এ ছাড়া ভারতেও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সর্বোপরি ঐতিহাসিকভাবে ভারত এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব সময়ই ছিল ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে সোচ্চার।

এ অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন মিয়ানমারের প্রতিবেশীও বটে। চীন নানা কারণেই মিয়ানমারকে ভালোভাবে জানে ও বোঝে। রোহিঙ্গা সমস্যায় চীনের পদক্ষেপ ইতিবাচক ফল আনবে বলেই বিশ্বাস। তাই চীনকে সম্মত করাতে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো যেতে পারে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে ভারত ও চীনকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্পৃক্ত করতে পারলে সমস্যাটির সমাধান অনেকটাই সহজ হবে। বাংলাদেশ সরকার এই দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের সহযোগিতা কামনা করতেই পারে। তাতে লাভ ছাড়া লোকসান হবে না।

সম্প্রতি উত্তর রাখাইনে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলেছেন স্থানীয় এক মন্ত্রী। ফলে সেখানকার অধিবাসীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে এতে দরিদ্র রাখাইনদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। যদি মহৎ উদ্দেশ্যে এটা করা হয়, তবে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার; কিন্তু প্রতিনিয়ত যা ঘটছে তাতে আমাদের কি তাই মনে হয়? রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করেই কি ওখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে? জানি এর উত্তর একমাত্র মিয়ানমারই দিতে পারবে আর কেউ নয়।

জাতিসংঘের মহাসচিব তাঁর উদ্বিগ্নতার কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও তিনি নেবেন—এ রকম আশা করাই যেতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংগি লি বলেন, সু চির উচিত এখনই সহিংসতা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া। ৫ সেপ্টেম্বর তিনি আরো বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে সংঘটিত সহিংস পরিস্থিতির চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। মানুষের জীবন রক্ষায় সব দেশের সরকার এগিয়ে আসবে, জাতিসংঘ এটাই প্রত্যাশা করে।

বর্তমানে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এক ভয়াবহ অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এখনই রোহিঙ্গা নিধন আর বিতাড়ন বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে এটি যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আমরা অনুমানও করতে পারি না। তাই আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরো জোরালো ও বহুমুখী হওয়া দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উদ্যোগ অবশ্যই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জাতিসংঘ ছাড়াও চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে বিষয়টি সমাধানে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা কামনা করতে পারেন। ওই সব দেশের সঙ্গে আমাদের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে পুঁজি করে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে।

সব শেষে একটি কথা এখানে না বললেই নয়। রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুসলমান বা হিন্দু হিসেবে নয়, বর্তমান বিশ্বসমাজের সদস্য হিসেবে। তবে একান্তভাবেই মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে। কিন্তু মিয়ানমার সেই মানুষগুলোকেই হত্যা করছে, অর্থাৎ তাদের নাগরিকদের হত্যা করছে। সর্বোপরি মানবিকতাকে হত্যা করছে। মুসলিম দেশগুলোই যে শুধু এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাবে বা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে এসে দাঁড়াবে, তা নয়। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, সোচ্চার হতে হবে এই নির্যাতন বন্ধ করতে। আমাদের মনে আছে, আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে পৃথিবীর মানবিকবোধসম্পন্ন প্রত্যেক মানুষ সেদিন একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ চিরদিনের জন্য মুছে দিয়েছিল। ধর্মের বিষয়টি ক্ষণিকের জন্যও সামনে আসেনি। আজকের রোহিঙ্গা ইস্যুটিও আমরা হিন্দু বা মুসলমানদের বিষয় হিসেবে দেখব না। আমরা সবাই মানুষের প্রতি অমানুষের নির্যাতনকে বন্ধ করতে রুখে দাঁড়াব। এ জন্য আমাদের দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক পথে এগোতে হবে, যাতে সারা বিশ্বের প্রত্যেক মানুষ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখে। আমরা চাই, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যাটির সমাধান হোক। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই, রোহিঙ্গাদের তাদের ভিটামাটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে সম্মত করাতে হবে। আর বিশ্ববাসী এ ব্যাপারে আমাদের পাশেই দাঁড়াবে—এ প্রত্যাশা রইল।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

image-id-663299

উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি

image-id-663296

আদর্শহীন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী

image-id-662710

তিনি কি ভয় পেয়ে গেলেন

image-id-662704

সরব সবুজে নীরব কর্মী

পাঠকের মতামত...
image-id-662320

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা

ছোট শিশুদের স্কুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই...
image-id-662008

স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা

পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী উভয়ে উপদ্রুত জাতিসত্তার...
image-id-661460

তৃতীয় ধারার জোট গঠনে সব বাধাই অরাজনৈতিক

বিশাল জনসমর্থিত দল না হলেও রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের কাছে কোনো...
image-id-661457

মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ইইউ-মার্কিন বিধি-নিষেধ

মিয়ানমারের ওপর, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বিধি-নিষেধ...
image-id-663597

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা

তিন মাস পর সোমবার অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের...
image-id-663592

ফিফার বর্ষসেরা একাদশে রিয়ালের ৫, বার্সার ৩

সোমবার রাতেই ঘোষণা করা হবে বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর নাম।...
image-id-663588

স্তন কেটে, ধর্ষণের পর লজ্জাস্থানে কাঠ গুঁজে রোহিঙ্গা নারীদের নির্যাতন

আগস্ট থেকে অক্টোবর। পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এরপরও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম...
image-id-663585

তারকাদের সত্য-মিথ্যা ১৩ সেক্স স্ক্যান্ডাল

হলিউড তারকাদের জীবনে ‘স্ক্যান্ডাল’ নিত্যদিনের ঘটনা। বলিউডেও এরকম স্ক্যান্ডাল নিয়ে...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com