Bangladesh News24

সব

সংবাদজগতে অস্থিরতা

চিন্ময় মুৎসুদ্দী

এ সপ্তাহে সংবাদজগতের দুটি সংবাদ আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। ভারতের কর্ণাটকে লংকেশ পত্রিকার সম্পাদক গৌরী লংকেশ দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অন্য সংবাদটি কম্বোডিয়ার, সেখানে সরকারের পছন্দ নয় এমন একটি পত্রিকা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে মালিকপক্ষ। এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই দেখা যায় খবরের কাগজে। মিসর, তুরস্ক, জিম্বাবুয়ে, মেক্সিকো—এমন অনেক দেশেই সংবাদমাধ্যম সরকার বা সরকারি দলের নানা হুমকি-ধমকির মধ্যেই কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিস্তার গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত হলেও কার্যক্ষেত্রে তা কণ্টকমুক্ত হচ্ছে না। সরকারের পাশাপাশি প্রভাবশালীরাও সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারে তত্পর। অপছন্দ হলে সাংবাদিককে হত্যা করতে এখন আর দ্বিধা করে না কেউ।

ভারতে গৌরীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কারণ তিনি হিন্দুত্ববাদের কড়া সমালোচক ছিলেন। সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর উগ্রবাদীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে।

গৌরী কোনো ব্যক্তির চরিত্র হনন করেননি, তাঁর বক্তব্য ছিল আদর্শকেন্দ্রিক। তিনি বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনীতির বিরুদ্ধে লিখতেন। তিনি হিন্দুত্ববাদকে স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতের আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করতেন। হিন্দুত্ববাদ বা ধর্মীয় উগ্রতা মানুষের কল্যাণে বড় ধরনের বাধা—এমন কথা তিনি বারবার লিখেছেন। নানাভাবে তাঁকে দমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত স্বার্থান্বেষীরা তাঁকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিল। কর্ণাটক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদারামাইয়া এ হত্যাকাণ্ডকে ‘গণতন্ত্র হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইন্ডিয়ান উইমেনস প্রেস কর্পস (আইডাব্লিউপিসি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, একজন সাংবাদিককে ‘থামিয়ে দেওয়া’ ভারতের গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক বার্তা বহন করে।
কম্বোডিয়ায় হুন সেন গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলেও আধুনিক সময়ের ছদ্মবেশী স্বৈরাচারী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আছেন প্রায় ২৪ বছর। আর ১৯৯৩ সালের নির্বাচনের আগে ভিয়েতনামিদের সঙ্গে নিয়ে খেমাররুজ সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন আরো প্রায় আট বছর আগে। সে হিসাবে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রায় ৩২ বছরের। যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে খেমাররুজদের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত লন নলের সরকারকে পরাজিত করে পলপট-খিউ সাম্পান খেমার সরকার প্রতিষ্ঠা করার কিছুকাল পর নেতৃত্বের বিরোধে জড়িয়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে যান। পরে ভিয়েতনামের প্রত্যক্ষ সাহায্যে পলপটের সরকার উত্খাত করে নমপেনে সরকার গঠন করেন হেং সামরিনকে সঙ্গে নিয়ে।

দ্য কম্বোডিয়া ডেইলির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযোগ হলো পত্রিকাটি বড় অঙ্কের কর পরিশোধ করেনি। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাটিকে ৬৩ লাখ মার্কিন ডলার কর পরিশোধ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৩ কম্বোডিয়ার ইতিহাসে মাইলফলক বছর। এ বছরই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সেখানে সাধারণ নির্বাচন হয়। পলপট-খিউ সাম্পানের খেমার সরকারের পতনের পর হুন সেন সরকার গঠন করলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ সরকার নির্বাচিত নয় বলে নানা অবরোধের মধ্যে পড়ে। ঘরের ভেতরেও নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সর্বজনীন নেতা নরোদম সিহানুকের ছেলে রনরিধের এফইউএনসিআইএনপিইসি (FUNCINPEC) দল শুরু থেকেই কম্বোডিয়ায় ভিয়েতনামের উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছিল। তারা ভিয়েতনাম বাহিনীর কম্বোডিয়া ত্যাগ ও তারপর সাধারণ নির্বাচন দাবি করে। শেষ পর্যন্ত হুন সেন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনে রাজি হলেও প্রশাসনে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় থাকেন। সে সময় নির্বাচনপূর্ব প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণে গিয়ে আমি নিজেও দেখেছি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দল সিপিপি (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি) রনরিধের দলীয় কর্মীদের ওপর প্রতিনিয়ত হামলা চালিয়েছে। তাদের সভা-সমাবেশ ভেঙে দিয়েছে। মধ্য কম্বোডিয়ার বাটামবাং অঞ্চলে এফইউএনসিআইএনপিইসি দলের কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করায় তারা বলেছিল, জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক কাজ করছে। কিন্তু হানাহানির ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সরকার ও সরকারি দলের চাপের মধ্যেও নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল দুই দলই প্রায় সমান সমান আসন পেয়েছে পার্লামেন্টে। এ অচলাবস্থা কাটানোর জন্য দুই প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন হুন সেন ও রনরিধ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে হুন সেনের কূটকৌশলে রনরিধ পিছিয়ে পড়েন। পরের নির্বাচনে হুন সেনের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সেই থেকে কম্বোডিয়ার একক শাসক হিসেবে নিজের ভিত্তি শক্ত করে নেন হুন সেন।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের চাপ দিতে থাকে সরকার। বেশ কয়েকটি পত্রিকা কৌশলে বন্ধ করে দেয় সরকার। এবার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনায় সদা সচেতন জনপ্রিয় এ পত্রিকা বন্ধ করার কৌশল হিসেবে একতরফাভাবে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পত্রিকাটির তরফ থেকে বলা হয়েছে, ‘করের পরিমাণ নিয়ে কর বিভাগ ও পত্রিকার মালিকপক্ষের বিরোধ রয়েছে। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যেত। কিন্তু পত্রিকাটিকে লক্ষ্যে পরিণত করা হয়েছে বলেই একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ’ জনমতের সামান্যতম বিরোধিতাও তিনি সহ্য করতে চান না। এরই মধ্যে বিরোধী দলের নেতা কেম সোখাকে আটক করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছে, যা সাধারণত স্বৈরাচারী সরকার করে থাকে। বিরোধী দল সেখানে জনসভা করতে পারে না। সরকারি দলের হামলায় বেশির ভাগ সভা পণ্ড হয়ে যায়। বিরোধী দলের কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। বিরোধী দলের সমর্থকদেরও চোখে চোখে রাখা হয়। পান থেকে চুন খসলে পুলিশ আর গোয়েন্দারা তেড়ে আসে।

দ্য কম্বোডিয়া ডেইলিকে বলা হয়েছে চোর। বিবিসি জানিয়েছে, খোদ প্রধানমন্ত্রী এ রকম অপবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ কর পরিশোধ করা না হলে তল্পিতল্পা বেঁধে নিয়ে বিদায় হতে হবে। ’ এ পত্রিকার পাশাপাশি রেডিও ফ্রি এশিয়া ও ভয়েস অব আমেরিকার বিরুদ্ধেও করের বাধ্যবাধকতা না মানার অভিযোগ আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতি নিয়ে এসব সংবাদমাধ্যমে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত।

ভারতে গৌরী হত্যা বা কম্বোডিয়ায় গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা। উগ্রবাদীরা ভিন্নমত স্তব্ধ করে দিতে চায়। কেউ ধর্মের দোহাই দেয় আর কেউ নানা ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করে। দেশে দেশে আজ গণমাধ্যম এভাবে স্বার্থান্বেষীদের রোষানলে পড়ছে। মুক্ত গণমাধ্যম সংকুচিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কথা, তাদের ওপর সবলদের নির্যাতনের বিষয়গুলো মানুষ জানতে পারছে না। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরাচার, পরিবারতন্ত্র, বাহুবলের দৌরাত্ম্য রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ বিষিয়ে তুলেছে।

কম্বোডিয়ায় হুন সেন ক্ষমতায় এসেছিলেন খেমাররুজ সরকারের নিষ্ঠুর আচরণের বিরোধিতা করে। ক্ষমতা সংহত করে ১৯৯৮ সালের পর তিনি নিজেই ক্রমে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেন বিরোধীদের ওপর। ১৯৯৩ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে মানবাধিকারকর্মী সকরে আমাকে বলেছিলেন, ‘কাকে বাছাই করব নির্বাচনে? প্রধান দুই শক্তি ভিয়েতনাম সমর্থিত হুন সেনকে যদি কুমির বলি, তবে খেমাররুজরা বাঘ। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক তৃতীয় শক্তির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ’ সকরে দীর্ঘদিন থাই সীমান্ত এলাকায় রিফিউজি ক্যাম্পে ছিলেন। প্যারিস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশে ফিরে যান। এত বছর পর সকরের কথা মনে করে বলতে হয়, খেমার বাঘরা মৃত; কিন্তু কুমির হুন সেন এখন বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। সকরের প্রত্যাশিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক তৃতীয় শক্তির দেখা তারা পায়নি।

দ্য কম্বোডিয়া ডেইলি হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার আরেকটি স্তম্ভ নুইয়ে পড়বে। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই পারমাণবিক বিশ্বের সাধারণ মানুষ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পারে সাহসী গণমাধ্যমের কল্যাণে। কিন্তু সেখানে এখন আঘাতের পর আঘাত। ক্ষমতার ভাগীদাররা সামান্যতম বিরোধিতাও সহ্য করতে রাজি নন। আর সেই বিরোধিতার কথা যাঁরা ছড়িয়ে দেন মানুষের মধ্যে, তাঁদের স্তব্ধ করার কূটকৌশল প্রয়োগে সদা তত্পর প্রতাপশালীরা। হুন সেন ৩৪ বছর কাটিয়ে দিলেন। থাকবেন আরো দীর্ঘদিন। কিন্তু শেষ তো আছেই। ১৯৯৩ সালের তরুণ সকরে এখন প্রায় প্রবীণ। তাঁর প্রত্যাশা একদিন পূরণ হবে। তখন নব নব দ্য কম্বোডিয়া ডেইলির আত্মপ্রকাশ ঘটবে, যারা আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতার নুইয়ে পড়া স্তম্ভটির শির উঁচু করে ধরবে। সেদিন ভারতের গৌরী লংকেশ, ঢাকার সাগর-রুনি, যশোরের শামছুর রহমান, এম সাইফুল আলম মুকুল, বগুড়ার দীপঙ্কর চক্রবর্তী, খুলনার মানিক সাহা ও আরো অনেকের আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক: সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক

chinmoy35@gmail.com

image-id-663299

উন্নয়নের অন্তরায় দুর্নীতি

image-id-663296

আদর্শহীন রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী

image-id-662710

তিনি কি ভয় পেয়ে গেলেন

image-id-662704

সরব সবুজে নীরব কর্মী

পাঠকের মতামত...
image-id-662320

শিক্ষক এবং শিক্ষকতা

ছোট শিশুদের স্কুল দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলেই...
image-id-662008

স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা

পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শ সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রী উভয়ে উপদ্রুত জাতিসত্তার...
image-id-661460

তৃতীয় ধারার জোট গঠনে সব বাধাই অরাজনৈতিক

বিশাল জনসমর্থিত দল না হলেও রাজনীতিসচেতন সাধারণ মানুষের কাছে কোনো...
image-id-661457

মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ইইউ-মার্কিন বিধি-নিষেধ

মিয়ানমারের ওপর, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর বিধি-নিষেধ...
image-id-663597

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা

তিন মাস পর সোমবার অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের...
image-id-663592

ফিফার বর্ষসেরা একাদশে রিয়ালের ৫, বার্সার ৩

সোমবার রাতেই ঘোষণা করা হবে বেস্ট ফিফা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীর নাম।...
image-id-663588

স্তন কেটে, ধর্ষণের পর লজ্জাস্থানে কাঠ গুঁজে রোহিঙ্গা নারীদের নির্যাতন

আগস্ট থেকে অক্টোবর। পেরিয়ে গেছে দু’মাস। এরপরও মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম...
image-id-663585

তারকাদের সত্য-মিথ্যা ১৩ সেক্স স্ক্যান্ডাল

হলিউড তারকাদের জীবনে ‘স্ক্যান্ডাল’ নিত্যদিনের ঘটনা। বলিউডেও এরকম স্ক্যান্ডাল নিয়ে...
© Copyright Bangladesh News24 2008 - 2017
Published by bdnews24us.com
Email: info@bdnews24us.com / domainhosting24@gmail.com